সম্পাদকীয়|Editorial
DOI:
https://doi.org/10.58666/iab.v21i84.344Abstract
[সম্পাদকীয়]
আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহর রহমতে ইসলামী আইন ও বিচার জার্নালের ৮৪তম সংখ্যা প্রকাশিত হলো। এবারের সংখ্যায় সমসাময়িক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে পাঁচটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সংখ্যায় প্রবন্ধগুলো আমাদের সময়ের নৈতিক, আইনগত ও আর্থিক সংকটসমূহ থেকে উত্তরণে ইসলামি নির্দেশনার একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিফলন এবং আধুনিক রাষ্ট্র, সমাজ ও বিশ্বায়নের যুগে আইন কেবল শাস্তি প্রয়োগের প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি মানুষের চরিত্র, সামাজিক ভারসাম্য এবং নৈতিকতার ধারক হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
‘শাতিমুর রাসূল (সা.)-এর শরঈ হুকুম: হানাফী ফিকহের আলোকে একটি বিশ্লেষণ’ শীর্ষক প্রবন্ধে রাসূল অবমাননার শরঈ হুকুম বিষয়ে হানাফী ফিকহের আলোকে রাসূল (সা.)-এর ধর্মীয় মর্যাদা ও এ মর্যাদা ক্ষুণœকারীর শাস্তি সম্পর্কে একাডেমিক আলোচনার মাধ্যমে একটি দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। হানাফী ফিকহ রাসূল (সা.)-এর প্রতি অবমাননাকর আচরণকে গুরুতর অপরাধ বিবেচনা করে এর শাস্তি মৃত্যুদ- নির্ধারণ করেছে। তবে শাতিমের তাওবার (প্রায়শ্চিত্ত) গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে ফকিহদের মধ্যে কিছু ব্যতিক্রমী মতামত পরিলক্ষিত হয়। ফিকহি যুক্তি ও ঐতিহাসিক মতপার্থক্য পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রবন্ধটিতে দেখানো হয়েছে ইসলামি আইন সামাজিক স্থিতিশীলতা ও রাসূল (সা.)-এর মর্যাদা রক্ষাকে কতটা গুরুত্ব দেয়। একইসাথে তাওবা গ্রহণযোগ্যতা বিষয়ে মতভেদ উল্লেখ করে গবেষণাটি ইসলামের বিচারিক ঐতিহ্যের বুদ্ধিবৃত্তিক বৈচিত্র্যও তুলে ধরেছে। ফলে আলোচনাটি কেবল একটি বিধান ব্যাখ্যা নয়; বরং ইসলামি আইনের দর্শনÑমর্যাদা, শৃঙ্খলা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার পারস্পরিক সম্পর্কের বলিষ্ঠতা প্রমাণ করেছে।
‘বাংলাদেশে ইনভিট্রো ফার্টিলাইজেশন ও প্রি-ইমপ্লান্টেশন জেনেটিক ডায়াগনোসিসের মাধ্যমে শিশুর লিঙ্গ নির্বাচন: একটি নৈতিক ও আইনি পর্যালোচনা’ শীর্ষক প্রবন্ধটি সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তির মাধ্যমে শিশুর লিঙ্গ নির্বাচন বিষয়ে সমসাময়িক ইসলামি গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি মানুষের জীবনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও তা নতুন নৈতিক প্রশ্নও সৃষ্টি করছে। এ গবেষণাটি দেখিয়েছে যে, শরিয়াহ নীতির আলোকে শর্তসাপেক্ষ অনুমতি, পারিবারিক সম্পর্কের বৈধতা, আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি নির্ভরতা এবং অপব্যবহার প্রতিরোধের বিধানসমূহ প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহারের ভিত্তি হতে পারে। মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবের নীতিমালার তুলনা করে বাংলাদেশের জন্য একটি শরিয়া-সমন্বিত নিয়ন্ত্রক কাঠামোর প্রস্তাব এই আলোচনাকে বাস্তব নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে উন্নীত করেছে। এতে স্পষ্ট হয় যে, ইসলামি শরীআহ প্রযুক্তিকে ধারণ করে তবে তা নৈতিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণমুখী করে।
‘যাকাতের অর্থে পথশিশুর পুনর্বাসনের রূপরেখা’ শীর্ষক প্রবন্ধটি যাকাতের অর্থে পথশিশুর পুনর্বাসন বিষয়টি আলোচনা মাধ্যমে যাকাতভিত্তিক সমাজকাঠামোতে সামাজিক ন্যায়বিচারের বাস্তব প্রয়োগ তুলে ধরেছে। যাকাত কেবল দান নয়; এটি একটি কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পথশিশুদের হাতে অর্থ তুলে দেওয়ার পরিবর্তে পরিকল্পিত পুনর্বাসনের রূপরেখা দেখাচ্ছে যে, ইসলামি অর্থনীতি সাময়িক সহায়তার চেয়ে টেকসই মানবিক উন্নয়নকে গুরুত্ব দেয়। দায়িত্বশীল তত্ত্বাবধান, শিক্ষা ও নাগরিক সুবিধার মাধ্যমে পুনর্বাসনের প্রস্তাব দারিদ্র্য বিমোচনে একটি কার্যকর মডেল উপস্থাপন করে।
‘বাংলাদেশে ব্যাংক খাতে আর্থিক দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রচলিত বিধান ও শরঈ নীতিমালা: একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা’ শীর্ষক প্রবন্ধে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে আর্থিক দুর্নীতি আলোচনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে সামনে এনেছে। আইন ও বিধি থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতি প্রতিরোধে ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধানে প্রবন্ধটি দেখিয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নৈতিক দায়বদ্ধতা অপরিহার্য। ইসলামি অর্থনৈতিক নীতিতে সম্পদ কেবল ব্যক্তিগত অধিকার নয়, বরং আমানত; ফলে আত্মসাৎ কেবল অপরাধ নয়, বিশ্বাসভঙ্গ। আধুনিক আইনে যেখানে শাস্তি বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কার্যকর হয়, ইসলামি নীতিতে অন্তর্গত নৈতিক বাধ্যবাধকতা আইনকে শক্তিশালী করে। গবেষণাটি দেখিয়েছে যে, প্রচলিত আইন ও শরঈ নীতির মধ্যে মৌলিক বিরোধ নেই; বরং শরয়ি নীতির নৈতিক কাঠামো যোগ হলে আইন অধিক কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থনৈতিক সুশাসনের আলোচনায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ও বাস্তবিক দিকনির্দেশনা।
‘কিশোর অপরাধীর দায়বদ্ধতা: ইসলামি আইন ও আধুনিক আইনের তুলনামূলক বিশ্লেষণ’ শীর্ষক প্রবন্ধে কিশোর অপরাধীর দায়বদ্ধতা বিষয়ে ইসলামি আইন ও আধুনিক আইনের তুলনামূলক বিশ্লেষণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি আলোচনার দ্বার উন্মোচন করেছে। আধুনিক সমাজে কিশোর অপরাধ বৃদ্ধি পাওয়াকে সাধারণত আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু গবেষণাটি দেখিয়েছেÑএটি মূলত একটি সামাজিক ও মানসিক বিকাশগত সমস্যা। ইসলামি আইনে নাবালকের পূর্ণ ফৌজদারি দায় স্বীকৃত নয়; বরং তাকে শিক্ষা, নৈতিক দিকনির্দেশনা ও সংশোধনের মাধ্যমে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই প্রধান লক্ষ্য। আধুনিক আইনেও কিশোর আদালত, পুনর্বাসন কেন্দ্র ও সংশোধনাগারের মাধ্যমে একই ধরনের উদ্দেশ্য অনুসরণ করা হচ্ছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিন্নতা প্রতীয়মান হয় যে, ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য প্রতিশোধ নয়, বরং সংশোধন। তবে ইসলামি আইন নৈতিক ও আধ্যাত্মিক গঠনে অধিক গুরুত্ব দেয়, আর আধুনিক আইন মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা ও সামাজিক পুনর্বাসনে জোর দেয়। উভয়ের সমন্বয় ভবিষ্যতের মানবিক বিচারব্যবস্থার একটি কার্যকর মডেল হতে পারে।
ইসলামী আইন ও বিচার জার্নালের ৮৪ তম সংখ্যা শুধু গবেষণাপত্রের সংকলন নয়; বরং আমাদের বিচারবোধ পুনর্বিবেচনার আহ্বান। এ সংখ্যার আলোচনাগুলো সমষ্টিগতভাবে একটি বড় বাস্তবতা তুলে ধরে যে, ইসলামি আইন ও আধুনিক আইনকে সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখার প্রবণতা প্রকৃতপক্ষে একটি ভুল ধারণা; বরং উভয়ই মানবকল্যাণের ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা নিয়ে কাজ করে। প্রবন্ধগুলোতে আধুনিক সময়ের ইসলামী গবেষণার নানা দিক উন্মোচিত হয়েছে, যা পাঠকদের জ্ঞানবৃদ্ধি ও অনুপ্রেরণায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। আশা করা যায়, এই সংখ্যার প্রবন্ধসমূহ পাঠকদের চিন্তাকে সমৃদ্ধ করবে এবং বরাবরের মতই আদৃত হবে।
- প্রধান সম্পাদক
Published
Issue
Section
License
Copyright (c) 2026 Abu Bakr Rafique Ahmad

This work is licensed under a Creative Commons Attribution 4.0 International License.



