সম্পাদকীয়|Editorial
DOI:
https://doi.org/10.58666/iab.v22i86.368Abstract
[সম্পাদকীয়]
আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহর মেহেরবাণীতে ইসলামী আইন ও বিচার জার্নালের ৮৬ তম সংখ্যা প্রকাশিত হলো। এবারের সংখ্যায় সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে চারটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
“অপরাধ দমনে ইসলামী ও প্রচলিত আইনের কার্যকারিতা: একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা” শীর্ষক প্রবন্ধে দৃশ্যমান হয়েছে যে, আইনের শাসনের অভাব, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপসহ নানাবিধ কারণে অপরাধ প্রতিরোধে প্রচলিত আইনকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করেছে। পক্ষান্তরে ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করার মাধ্যমে অপরাধবিমুখ প্রজন্ম গঠনের পরিপ্রেক্ষিতে অপরাধপ্রবণ জাহিলি সমাজেও ইসলামী আইনের বাস্তবায়নের ফলশ্রুতিতে অপরাধ দমনে অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে। প্রবন্ধটিতে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন কেসস্টাডি পর্যালোচনায় বাংলাদেশে গৃহিত আইনসমূহের ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে। বাংলাদেশে অপরাধ দমনে প্রচলিত অধিকাংশ আইন বৃটিশ আমলে প্রণীত হওয়ায় এতে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ^াস ও মূল্যবোধের প্রতিফলন না ঘটা এ আইনসমূহের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হিসেবে প্রতিয়মান হয়েছে। অপরাধ দমনে ইসলামী আইন গোষ্ঠী বিশেষের স্বার্থ রক্ষা না করে সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে নিবেদিত। গবেষক আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশে ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন জাতি গঠনের সাথে সাথে ভারসাম্যপূর্ণ আইন প্রণয়ন ও অপরাধীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের কৌশল নির্ধারণ করে ইসলামী আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আসার অবারিত সুযোগ রয়েছে।
“বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এর প্রেক্ষিতে সাধারণ শিক্ষা ধারার প্রাথমিক স্তরে ইসলামী শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগ: একটি পর্যালোচনা” শীর্ষক প্রবন্ধে বাংলাদেশে প্রাথমিক স্তরে ইসলামী শিক্ষার প্রয়োগের দুর্বলতা চিহ্নিত হয়েছে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এ মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলামী শিক্ষা বাধ্যতামূলক রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত থাকলেও নীতিমালায় এই বিষয়টির বাস্তব প্রয়োগ, কাঠামো, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং কার্যকর বাস্তবায়ন কৌশল সম্পর্কে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকায় প্রায়োগিক অর্থে সাধারণ শিক্ষা ধারার প্রাথমিক স্তরে ইসলামি শিক্ষার প্রয়োগ নিতান্তই অপ্রতুল। বিষয়বস্তু বিশ্লেষণের পাশাপাশি মূখ্য তথ্যদাতাদের সাক্ষাৎকারের সমন্বিত গবেষণার মাধ্যমে গবেষক দেখিয়েছেন যে, সাধারণ শিক্ষা ধারার প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাক্রম, পাঠ্যপুস্তক এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সমন্বয়ের মাধ্যমে মুসলিম শিক্ষার্থীদের যথাযথ ইসলামী শিক্ষা নিশ্চিত করে শিক্ষানীতি ঘোষিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জন করা সম্ভব। এছাড়াও গবেষক সাধারণ শিক্ষা ধারায় প্রাথমিক স্তরে আধুনিক মুসলিম বিশে^র জ্ঞান ও দর্শন অনুসরণে গবেষণাভিত্তিক শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রম প্রণয়নপূর্বক বাস্তবায়ন এবং শিক্ষাখাতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
“আত্মসাৎকৃত অর্থ-সম্পদ পুনরুদ্ধার: প্রচলিত আইন ও ইসলামী আইনের আলোকে একটি বিশ্লেষণ” শীর্ষক প্রবন্ধে পর্যালোচনা করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহে দুর্নীতি, ঋণ খেলাপি, অর্থ পাচার ইত্যাদির মাধ্যমে সীমাহীন অর্থ-আত্মসাৎ পরিলক্ষিত হচ্ছে। নিয়ন্ত্রণহীন অর্থ-আত্মসাতের ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের তীব্র তারল্য সংকট ও মানুষের আস্থাহীনতায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের অস্তিত্ব সংকটে পতিত হয়েছে। গবেষণায় ফুটে উঠেছে, অবৈধভাবে আত্মসাৎকৃত এ অর্থ-উদ্ধারে প্রচলিত আইনের কার্যকারিতা স্পষ্টত দৃশ্যমান নয়। গবেষক বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, গবেষণা, প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে আইনের দুর্বলতা ও আইন প্রয়োগে অব্যবস্থাপনা এবং ক্ষতিগ্রস্থদের ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির পথ দূরহ হওয়াকে বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ থেকে অবৈধ অর্থ-আত্মসাতের ঘটনা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। গবেষক বিদ্যমান সমস্যার সমাধানে আত্মসাৎকৃত অর্থ-সম্পদ উদ্ধারে ইসলামী শরিয়ার প্রবর্তিত মৌলিক নীতিমালার বাস্তবায়নকে আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। প্রবন্ধে আত্মসাৎকৃত সম্পদ উদ্ধার করে, বা অপরাধীর সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও বিক্রয় করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্থকে সহায়তা করার শরিয়া নীতিমালাকে বিদ্যমান সমস্যার কার্যকর সমাধান হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
“আধুনিক প্রজনন প্রযুক্তিতে সারোগেসির শরয়ী অবস্থান: একটি ফিকহী পর্যালোচনা” শীর্ষক প্রবন্ধে গর্ভাশয় ভাড়া প্রদান বা সারোগেসি (ঝঁৎৎড়মধপু) সংক্রান্ত বিষয়টি ফিকহী ও নৈতিক মানদ-ে পর্যালোচনা করা হয়েছে। আধুনিক প্রজনন প্রযুক্তিতে একজন নারী অন্য কোনো দম্পতির সন্তান গর্ভে ধারণ করেন এবং বিনিময়ে নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক গ্রহণ করা বা না করার এ প্রক্রিয়াকে বন্ধ্যাত্ব সমস্যা সমাধানে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উৎকর্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গবেষক বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, সারোগেসির বিদ্যমান প্রক্রিয়া ইসলামি আইনের লক্ষ্য বা ‘মাকাসিদুশ শরিয়াহ’-এর অন্যতম প্রধান স্তম্ভ “বংশরক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক। এ প্রবন্ধে সারোগেরি সংক্রান্ত সমসাময়িক ফকিহ্ ও ফতোয়া বোর্ডের নিষিদ্ধ (হারাম) বলে গণ্য করার সিদ্ধান্তের পাশাপাশি অন্যদল গবেষক কর্তৃক বিশেষ জরুরি পরিস্থিতিতে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে এর বৈধতা দেওয়ার দলিল ও যুক্তিগুলো পর্যালোচনা করেছেন। গবেষক সারোগেসির বিভিন্ন পদ্ধতি, এর বিপক্ষে উপস্থাপিত যুক্তিসমূহ এবং বিপক্ষীয় মতের খ-নসমূহ নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করে সারোগেসি সম্পর্কে ইসলামি আইনি ব্যবস্থায় একটি সুস্পষ্ট, নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়নের সুপারিশ করেছেন। গবেষণাটিতে নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা দেখানো হলেও নীতিমালা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো মডেল উপস্থাপিত হয়নি, যা গবেষণাটির মধ্যে একটি সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে। মাযহাবগত মতপার্থক্য, বিভিন্ন দেশের অনৃসৃত নীতিতে বৈপরীত্য বিবেচনায় সারোগেসি সম্পর্কে গবেষক একক কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেননি। তদুপরি, মুসলিম সমাজে সারোগেসি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মানবিক প্রয়োজন, নৈতিক বিবেচনা এবং ইসলামি ফিকহের মূলনীতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত প্রদান এ গবেষণার ফলাফল হিসেবে গৃহীত হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, এ সংখ্যার প্রতিটি প্রবন্ধ সমসাময়িক বাস্তবতার আলোকে ইসলামী আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রাসঙ্গিকতা, কার্যকারিতা এবং চ্যালেঞ্জসমূহকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছে। অপরাধ দমন, শিক্ষাব্যবস্থা, আর্থিক দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং আধুনিক প্রজনন প্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রয়োগযোগ্যতা তুলে ধরার মাধ্যমে এ সংখ্যাটি জ্ঞানচর্চার একটি তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হবে। আশা করা যায়, গবেষক, শিক্ষার্থী ও সচেতন পাঠকমহল এ প্রবন্ধসমূহ পাঠের মাধ্যমে ইসলামী আইন ও সমাজব্যবস্থার কয়েকটি দিক সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করবেন এবং সমকালীন সমস্যার টেকসই সমাধান অনুসন্ধানে নতুন দিকনির্দেশনা খুঁজে পাবেন।
Downloads
Published
Issue
Section
License
Copyright (c) 2026 Abu Bakr Rafique Ahmad

This work is licensed under a Creative Commons Attribution 4.0 International License.



